জুড়ী, মৌলভীবাজার: মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মধ্যে গভীর চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে করোনা মহামারী পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক চাপ এবং বাল্যবিবাহের কারণে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত দুই বছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির হার কমলেও ঝরে পড়ার হার বেড়েছে প্রায় ৫%, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেও চিত্রটি একই রকম, যেখানে প্রায় ৭% শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, বিশেষত মেয়ে শিক্ষার্থীরা।
স্থানীয় অভিভাবকরা জানান, অর্থনৈতিক সংকট এবং জীবিকা নির্বাহের তাগিদ অনেক পরিবারকে তাদের সন্তানদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে কাজে লাগাতে বাধ্য করছে। জুড়ীর পাহাড়ি ও গ্রামীণ অঞ্চলে এই সমস্যা প্রকট। অনেক পরিবার দারিদ্র্যের কারণে তাদের সন্তানদের স্কুলের খরচ বহন করতে পারছে না, এমনকি উপবৃত্তির স্বল্পতাও এক্ষেত্রে একটি কারণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক বলেন, “আমার ছেলে নবম শ্রেণিতে পড়ত। কিন্তু সংসারের খরচ জোগাতে ওকে চা দোকানে কাজ নিতে হয়েছে। জানি, এতে ওর ভবিষ্যৎ নষ্ট হচ্ছে, কিন্তু কী করব? আমাদের পেটে ভাত না থাকলে তো পড়াশোনা চলে না।”
মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। স্থানীয় এনজিও কর্মীরা জানান, করোনা মহামারীর সময় স্কুল বন্ধ থাকায় এবং দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে অনেক মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা তাদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ছিন্ন করেছে। জুড়ী উপজেলায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, সামাজিক সচেতনতার অভাব এখনও একটি বড় বাধা।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছি, যেমন শিক্ষার্থীদের নিয়মিত স্কুলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, অভিভাবকদের সাথে কাউন্সেলিং করা এবং উপবৃত্তির আওতা বাড়ানোর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা। তবে, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কারণগুলো এক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা বাল্যবিবাহ রোধে স্থানীয় প্রশাসন ও এনজিওদের সাথে যৌথভাবে কাজ করছি, কিন্তু এর সুফল পেতে সময় লাগবে।”
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি জুড়ীর দীর্ঘমেয়াদী মানবসম্পদ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, স্থানীয় কমিউনিটি, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি। স্কুলগুলোতে মিড-ডে মিল চালু করা, শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বৃদ্ধি করা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে এই প্রবণতা কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।















