মহাভারতের চিরায়ত এক উপাখ্যানের আধুনিক উপস্থাপনার সাক্ষী হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক। নাট্যকার মাসুম রেজা রচিত এবং শামসুল আলম বকুলের নির্দেশনা ও প্রযোজনায় ‘ডায়াস্পোরা ইউএসএ ইনক’ মঞ্চস্থ করলো তাদের বহু-প্রতীক্ষিত নাটক ‘নিত্যপুরাণ’। গেল ১৪ ও ১৫ই জুন (শনি ও রবিবার) নিউইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্ট সেন্টারে প্রদর্শিত হয় নাটকটি।
উভয়দিন প্রায় চারশত আসনের থিয়েটার কানায় কানায় পূর্ণ ছিল, যা প্রবাসী বাঙালিদের মঞ্চনাটকের প্রতি গভীর আগ্রহ ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
দুই দিনব্যাপী এই আয়োজনে দর্শকদের পিনপতন নীরবতার মাধ্যমে উপভোগের বিষয়টি ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

মহাভারতের পরিচিত কাহিনি মাসুম রেজা যেভাবে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন, সেই সাথে নির্দেশক শামসুল আলম বকুলের নিপুণ নির্দেশনা এবং অভিনেতাদের প্রাণবন্ত অভিনয় দর্শকদের আক্ষরিক অর্থেই বিমোহিত করে রাখে। দর্শকরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো উপভোগ করেছেন প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি সংলাপ।
বিশেষ করে, নাট্যকার মাসুম রেজা নিজে ছাড়াও দেশবরেণ্য অনেক নাট্যজন, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ নাটকটি উপভোগ করেন। তাদের উপস্থিতি এই আয়োজনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে।
নাটক শেষে লেখক নাট্যকার মাসুম রেজা, নির্দেশক শামসুল আলম বকুল, ডায়াস্পোরা ইউএসএ ইনক-এর সভাপতি ডা. প্রতাপ দাস এবং সাধারণ সম্পাদক ও নাট্যাভিনেতা এজাজ আলম সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। বক্তারা নাটকের প্রযোজনা এবং দর্শকদের অভূতপূর্ব সাড়ার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

এই নাটকে একলব্য চরিত্রে হীরা চৌধুরী তার অনবদ্য অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের আলাদাভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং তার পরিবেশনা ব্যাপক প্রশংসিত হয়।
‘নিত্যপুরাণ’ কেবল একটি নাটক ছিল না, এটি ছিল প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতি ও নাট্যচর্চার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে, মানসম্মত নাটক আজও দর্শকদের মন জয় করতে পারে এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারে। এই সফল মঞ্চায়ন নিঃসন্দেহে নিউইয়র্কের বাংলা নাট্যজগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলো।

‘নিত্যপুরাণ’ নাটকটির গল্প নিম্নবর্ণের সন্তান একলব্যকে ঘিরে। পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গে অস্ত্রবিদ্যা শেখার জন্য যিনি গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে যান। কিন্তু নিচু জাত বলে তাকে প্রথমে শেখাতে চান না দ্রোণাচার্য। যদিও এক পর্যায়ে তার কাছে ধনুর্বিদ্যা শেখার সুযোগ পান একলব্য। কিন্তু গুরুর আরেক শিষ্য পঞ্চপাণ্ডবের এক পাণ্ডব অর্জুন একলব্যের কাছে পরাজিত হন ধনুর্বিদ্যায়। তখন গুরু দ্রোণাচার্য একলব্যকে আঙুল কেটে গুরুদক্ষিণা দিতে নির্দেশ দেন। মহাভারতে বর্ণিত নিম্নবর্গের এই বীরযোদ্ধার করুণ কাহিনিই নাটকটির উপজীব্য।
‘নিত্যপুরাণ’ নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন হীরা চৌধুরী, স্বাধীন চৌধুরী, বাবর খাদেমী, লায়লা ফারজানা, আলমা ফেরদৌসী লিয়া, সৈয়দ জাকির আহমদ রনি, রিপন সওকত রহমান, বসুনিয়া সুমন, সিফাত পলক, তাহমিনা মোস্তাফা।

এই নাটকের একটি প্রধান চরিত্র হল একলব্য, যেখানে হীরা চৌধুরী অভিনয় করেন। দ্রৌপদী চরিত্রে অভিনয় করেছেন তাহমিনা মোস্তাফা।
নিউইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্ট সেন্টারে প্রদর্শিত এই নাটকের কোরিওগ্রাফিতে ছিলেন তমালিকা কর্মকার।
মিলনায়তন ব্যবস্থাপনায় ছিলেন ওবায়েদুল্লাহ মামুন, শ্যামা কর, রানা জামান, বদরুজ্জামান রুহেল, দিপু দাশ, প্রতিমা সুমী, কিশোর মজুমদার, রাবেয়া আলম রুবি, মাকসুদা আহমেদ । মঞ্চ নির্মান ও পরিকল্পনায় ছিলেন, বাবর খাদেমি,আলমা ফেরদৌসি লিয়া, লায়লা ফারজানা, মোহাম্মদ তসলিম। সঙ্গীত পরিকল্পনায় অসীম নট্ট ও শব্দ নিয়ন্ত্রণে লামিয়া আলম অদ্বিতীয়া।
২০০১ সালের ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশে বেইলি রোডের মহিলা সমিতি মঞ্চে ‘নিত্যপুরাণ’-এর সর্বপ্রথম প্রদর্শনী হয়।














