বড়লেখায় বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতা সভা, অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির আহ্বান

বড়লেখা, মৌলভীবাজার: মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এক বিশেষ সভার আয়োজন করা হয়েছে। সভায় বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে আলোচনা এবং এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়েছে। রবিবার (১৫ জুন, ২০২৫) বিকেলে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপজেলা প্রশাসন এবং একটি স্থানীয় বেসরকারি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বাল্যবিবাহ বাংলাদেশের একটি পুরনো সামাজিক সমস্যা, যা বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় এখনও বিদ্যমান। বড়লেখা উপজেলাতেও এই প্রবণতা পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি। অর্থনৈতিক দুর্বলতা, শিক্ষার অভাব এবং পুরোনো ধ্যানধারণা বাল্যবিবাহের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। বাল্যবিবাহের কারণে মেয়ে শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে এবং তাদের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি হয়।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুফিয়া আক্তার বলেন, “বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি যা একটি মেয়ের ভবিষ্যৎ জীবনকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। আমরা আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দিচ্ছি। কারণ, শুধু আইন দিয়ে এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক পরিবর্তন।” তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান, “আপনারা আপনাদের মেয়েদের শিক্ষিত করুন, তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করুন। একটি শিক্ষিত মা একটি শিক্ষিত জাতি গঠনে সহায়তা করেন।”

আলোচনা সভায় বাল্যবিবাহের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি, যেমন অল্প বয়সে মাতৃত্বের কারণে মা ও শিশুর উচ্চ মৃত্যুহার, অপুষ্টি এবং বিভিন্ন রোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। আইন বিশেষজ্ঞরা বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ সম্পর্কে তথ্য দেন এবং বাল্যবিবাহের সাথে জড়িতদের শাস্তির বিধান সম্পর্কেও অবগত করেন।

সভায় উপস্থিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বাল্যবিবাহ রোধে নিজেদের সক্রিয় ভূমিকার অঙ্গীকার করেন। তারা বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিগুলোকে আরও সক্রিয় করা হবে এবং কোন বাল্যবিবাহের খবর পেলে সাথে সাথে প্রশাসনকে অবহিত করা হবে। এছাড়া, স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হবে।

স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ‘নারী উন্নয়ন ফোরাম’ এর প্রধান বলেন, “আমরা মনে করি, বাল্যবিবাহ বন্ধ করার জন্য মেয়েদের ক্ষমতায়ন জরুরি। তাদের শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে তারা স্বাবলম্বী হতে পারে। এর ফলে তারা পরিবারের উপর নির্ভরশীল থাকবে না এবং তাদের বিয়ে নিয়ে তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন হবে না।”

উপস্থিত অভিভাবকরা এই ধরনের সচেতনতা সভার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন এবং বাল্যবিবাহ রোধে প্রশাসনের সকল পদক্ষেপে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। আশা করা হচ্ছে, এই ধরনের সভার মাধ্যমে বড়লেখা উপজেলায় বাল্যবিবাহের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং আরও বেশি মেয়ে শিশু শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here